
ডেক্স নিউজ, গোয়াইনঘাট (সিলেট) :
সিলেটের সীমান্তবর্তী তিন উপজেলা—গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর ও কোম্পানীগঞ্জে এখন কেবলই হাহাকার। একসময়ের কর্মচঞ্চল জাফলং, ভোলাগঞ্জ ও বিছনাকান্দি এখন নিস্তব্ধ। দীর্ঘ দিন ধরে বালু ও পাথর কোয়ারিগুলো বন্ধ থাকায় কর্মহীন হয়ে পড়েছেন লক্ষ লক্ষ শ্রমিক। আর এই তীব্র বেকারত্বের প্রভাবে জনপদে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাইসহ নানা সামাজিক অপরাধ।
বন্ধ কোয়ারি, দিশেহারা শ্রমিক ও ব্যবসায়ী:
উত্তর সিলেটের এই অঞ্চলের মানুষের প্রধান জীবিকা ছিল পাথর ও বালু আহরণ। কিন্তু ইকো-ট্যুরিজম রক্ষা ও পরিবেশগত কারণ দেখিয়ে দীর্ঘ দিন ধরে কোয়ারিগুলো থেকে পাথর উত্তোলন বন্ধ রাখা হয়েছে। ফলে জাফলংয়ের শত শত ক্রাশার মিল এখন অচল হয়ে পড়ে আছে। এই শিল্পের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত কয়েক লক্ষ শ্রমিক আজ পুরোপুরি কর্মহীন। শুধু শ্রমিকই নয়, অনেক বড় বড় ব্যবসায়ী ব্যাংক ঋণ আর লোকসানের চাপে এখন দেউলিয়া হওয়ার পথে। হাজার হাজার শ্রমিকের ঘরে আহার নেই, চলছে চরম মানবেতর জীবনযাপন।
চুরির মহোৎসবে জনজীবন অতিষ্ঠ:
কর্মসংস্থান হারানো এক বিশাল জনগোষ্ঠীর মাঝে দেখা দিয়েছে তীব্র অভাব। আর এই অভাবের তাড়নায় এলাকায় আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে চুরি ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। সম্প্রতি গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর ও কোম্পানীগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিন চুরির খবর পাওয়া যাচ্ছে। চোরদের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না পবিত্র মসজিদও। মসজিদের মাইক, আইপিএস-এর ব্যাটারি, এমনকি দানবাক্স পর্যন্ত চুরি হচ্ছে।
এছাড়া গ্রামগুলোতে গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি চুরি এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাস্তাঘাটে সুযোগ পেলেই চলছে ছিনতাই। এমনকি গাড়ি ও গাড়ির ব্যাটারি এবং পথচারীদের মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
জনসাধারণের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ:
এলাকাবাসীর অভিযোগ, একসময় এই অঞ্চলটি অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত সমৃদ্ধ ছিল, কিন্তু কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মানুষ এখন দিশেহারা। বেকারত্বের এই অভিশাপ তরুণ প্রজন্মকে অপরাধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। স্থানীয়রা মনে করছেন, দ্রুত সঠিক কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না করলে বা কোয়ারিগুলো নিয়ে কোনো বিকল্প চিন্তা না করলে এই অঞ্চলের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও ভয়াবহ অবনতি ঘটবে।
ভুক্তভোগী এক শ্রমিক আর্তনাদ করে বলেন, "আগে পাথর তুলে খেয়ে-পরে ভালোই ছিলাম। এখন কাজ নেই, ঘরে খাবার নেই। পেটের দায়ে মানুষ এখন খারাপ পথে পা বাড়াচ্ছে। আমাদের বাঁচানোর ব্যবস্থা করেন।"
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য ও অনিশ্চয়তা:
এদিকে আজ ৭ মে (২০২৬) দুপুরে সচিবালয়ে সিলেট বিভাগের পাথর ও বালুমিশ্রিত পাথর কোয়ারির সর্বশেষ অবস্থা নিয়ে আয়োজিত এক সভা শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি জানান, উচ্চপর্যায়ের কমিটির রিপোর্ট পাওয়ার পর কোয়ারি ইজারা প্রদানের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, জাফলংয়ের মতো ‘ইকোলজিক্যালি ক্রিটিক্যাল এরিয়া’ (ECA) ঘোষিত স্থানগুলো ইজারার আওতামুক্ত থাকবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানান, কমিটির রিপোর্ট চলতি মাসের শেষে পাওয়ার পর জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এছাড়া উচ্চ আদালতে ঝুলে থাকা মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হবে।
হতাশায় শ্রমিক-ব্যবসায়ী সমাজ:
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন বক্তব্যে আশার চেয়ে আশঙ্কাই বেশি দেখছেন স্থানীয় শ্রমিক ও ব্যবসায়ীরা। বিশেষ করে জাফলংয়ের মতো বড় কোয়ারি ইজারার আওতামুক্ত রাখার ঘোষণায় লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। স্থানীয় সচেতন মহল মনে করেন, কেবল পুলিশি তৎপরতা দিয়ে এই অপরাধ দমন সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন টেকসই কর্মসংস্থান। পরিবেশ রক্ষা করে সনাতন পদ্ধতিতে পাথর উত্তোলনের ব্যবস্থা করা অথবা এই বিশাল শ্রমিক গোষ্ঠীকে বিকল্প কর্মসংস্থানে যুক্ত করতে সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করছেন উত্তর সিলেটের মানুষ।